কারাগারে থেকেও রিভিউ আবেদনে মনোনয়ন বৈধ পেলেন বরিশালের সবচেয়ে ধনী প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপু
রুবেল সরদার, বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধিঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরিশালের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও আলোচিত প্রার্থী আলহাজ্ব গোলাম কিবরিয়া টিপু। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় কাগজপত্রের কিছু অসঙ্গতির কারণে তার মনোনয়ন প্রাথমিকভাবে স্থগিত করা হলেও, কারাগারে থাকা অবস্থায় রিভিউ আবেদন করলে নির্বাচন কমিশন তা পুনর্বিবেচনা করে বৈধ ঘোষণা করে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে বরিশালের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. খায়রুল আলম আনুষ্ঠানিকভাবে টিপুর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এই ঘোষণার পর বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ–মুলাদী) আসনে নির্বাচনী উত্তাপ নতুন মাত্রা পেয়েছে।
নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৮) সময় টিপুর বার্ষিক আয় ছিল ব্যাংক সুদ ও মৎস্য খাতসহ ছয় কোটি টাকার বেশি। সে সময় করমুক্ত মৎস্য আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ লাখ টাকা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ছিল চারটি গাড়ি, ব্যাংক জমা বিপুল অর্থ এবং প্রায় ১৫০ ভরি স্বর্ণ। স্থাবর সম্পদ হিসেবে তিনি অকৃষি জমি, একাধিক দালান ও ভবন, পাঁচটি বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট, মৎস্য খামার এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য উল্লেখ করেছিলেন। ওই সময় তার ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৩ লাখ টাকা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৪) এ এসে তার সম্পদে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে। বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া, ব্যবসা, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক জমা মিলিয়ে তার আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। কৃষিজমির মূল্য দাঁড়ায় ৬১ কোটি টাকার বেশি। একই সঙ্গে তার ব্যাংক ঋণ বেড়ে প্রায় ৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় পৌঁছায়।
সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৫) উপলক্ষে দাখিল করা হলফনামায় দেখা যায়, টিপুর বার্ষিক আয় কমে দাঁড়িয়েছে তিন কোটি ৮৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। বিশেষ করে শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র থেকে আয় ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৭৯ শতাংশ কমেছে। তবে আয়ের এই পতনের বিপরীতে তার অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
২০২৫ সালের হলফনামা অনুযায়ী টিপুর নিজের নামে অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ৩৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে শেয়ার, ব্যাংক আমানত, স্থায়ী আমানত, গাড়ি, স্বর্ণ ও আগ্নেয়াস্ত্র। স্ত্রীর নামেও প্রায় ছয় কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ দেখানো হয়েছে। স্বামী-স্ত্রী মিলিয়ে স্বর্ণের পরিমাণ প্রায় ২০০ ভরি। স্থাবর সম্পদের ক্ষেত্রে টিপুর নিজের নামে কৃষি ও অকৃষি জমি, বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট মিলিয়ে আনুমানিক ১৮ কোটি টাকার বেশি সম্পদের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। স্ত্রীর নামেও কৃষিজমি ও একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে, যেগুলো হেবা দলিলের মাধ্যমে পাওয়া বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়ের উৎস বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালে যেখানে শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র থেকেই টিপুর মোট আয়ের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ এসেছিল, ২০২৫ সালে এসে সেই খাতের অবদান কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এ বছর তার মোট আয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ এসেছে ব্যবসা থেকে, প্রায় ১০ শতাংশ এসেছে বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া থেকে এবং বাকি আয় এসেছে অন্যান্য উৎস থেকে।
টিপুর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় আওয়ামী লীগের মাধ্যমে। তিনি রমনা থানা যুবলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। পরে বিএনপিতে যোগ দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। ২০০৮ ও ২০১৮ সালে তিনি বরিশাল-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৩ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের সমর্থনে নির্বাচিত হলেও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সংসদ বিলুপ্ত হওয়ায় তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান। পরবর্তীতে ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তবে কারাগারে থেকেও তিনি জাতীয় পার্টির হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন এবং শেষ পর্যন্ত তা বৈধতা পায়।
কারাগারে থেকেও মনোনয়ন বৈধতা ফিরে পাওয়াকে রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকেই আইনি লড়াইয়ের বড় জয় হিসেবে দেখছেন। গোলাম কিবরিয়া টিপুর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে বরিশাল অঞ্চলের নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।



















