বরিশাল-০৩ আসনে কারাগারে থেকেও আলোচনায় জাপার টিপু: কে এই টিপু?
বাবুগঞ্জ, (বরিশাল) প্রতিনিধি:
বরিশাল-০৩ সংসদীয় আসন—বাবুগঞ্জ ও মুলাদী। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আসনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কারাবন্দি সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু। এক বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকলেও নির্বাচনী রাজনীতিতে তাকে ঘিরে শুরু হয়েছে নানা হিসাব–নিকাশ ও বিশ্লেষণ।
গত রোববার বিকেলে বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে টিপুর পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির অঙ্গ সংগঠন জাতীয় ছাত্র সমাজের দুই নেতা এই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
টিপুর ব্যক্তিগত সহকারী ফাইজুল হক সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বরিশাল-০৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। দলীয়ভাবে নির্বাচন না হলে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। তবে বিষয়টি দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
এ বিষয়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা বলেন, জাতীয় পার্টি একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। সে কারণে নিয়ম অনুযায়ী তাদের মনোনয়নপত্র দেওয়া হয়েছে।
কে এই গোলাম কিবরিয়া টিপু
গোলাম কিবরিয়া টিপু বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর জন্ম ১৯৫৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর। শৈশব কেটেছে ঢাকায়। ধানমন্ডি প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি তেজগাঁও পলিটেকনিক হাইস্কুল থেকে এসএসসি, ফরিদপুরের শিবচর কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা তেজগাঁও কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনে সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও পরবর্তী সময়ে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঘুরে ১৯৯০ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকায় গ্রুপ কমান্ডার মোহাম্মদ জয়নালের নেতৃত্বে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন বলেও জানা গেছে।
রাজনীতির পাশাপাশি তিনি একজন শিল্পপতিও। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ফারহান নেভিগেশন কোম্পানি ও আগরপুর নেভিগেশন কোম্পানির মাধ্যমে নৌপরিবহন খাতে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
রাজনৈতিক পথচলা ও নির্বাচনী ইতিহাস
জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী এই নেতা গত চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে তিনবার বরিশাল-০৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ২০০৯, ২০১৮ এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন। প্রতিবারই তিনি লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন।
এর আগে ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে জাপার একক প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পরাজিত হন। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের সমর্থন পেলেও তিনি পরাজিত হন ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী অ্যাডভোকেট শেখ টিপু সুলতানের কাছে। তবে পরবর্তী নির্বাচনে আবারও এই আসনে জয়ী হন তিনি।
মামলা ও কারাবাস
গত বছরের ১৫ নভেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে বরিশালে একটি এবং রাজধানীতে জুলাই আন্দোলন–সংক্রান্ত একটি হত্যাসহ মোট তিনটি মামলা রয়েছে। কয়েকটি মামলায় তিনি জামিন পেলেও একটি মামলায় জামিন না হওয়ায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
টিপুর আইনজীবী বশির আহমেদ সবুজ জানান, জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবেই গোলাম কিবরিয়া টিপু নির্বাচনে অংশ নেবেন।
নির্বাচনী সমীকরণ
এদিকে একই আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানের অনুসারীদের অবস্থান আলাদা। মুলাদী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুস সাত্তার খান স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন বলেও আলোচনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাত্তার খান প্রার্থী হলে বিএনপির ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও ওয়ার্কার্স পার্টির ভোট টিপুর পক্ষে একীভূত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হয়েছেন উপাধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন বরিশাল মহানগর আমির জহির উদ্দিন মো. বাবর। এ দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জোরালো হতে পারে। এ ছাড়া আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদও আলোচনায় রয়েছেন, যদিও এলাকায় দলটির সাংগঠনিক ভিত তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের বাবুগঞ্জ উপজেলা শাখার সিনিয়র সহসভাপতি সেলিম রেজা বলেন, গোলাম কিবরিয়া টিপুর প্রার্থী হতে কোনো আইনি বাধা নেই। তিনি প্রার্থী হলে বরিশাল-০৩ আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে। লড়াই হতে পারে ত্রিমুখী কিংবা চতুর্মুখী।
কারাগারে থেকেও গোলাম কিবরিয়া টিপুকে ঘিরে তাই বরিশাল-০৩ আসনে রাজনীতির মাঠে শুরু হয়েছে নতুন করে হিসাব–নিকাশ।



















