সুগন্ধার ভাঙনে বিলীন মসজিদ-বসতভিটা, ঝুঁকিতে বাবুগঞ্জ বাজার
বাবুগঞ্জ প্রতিনিধি: বরিশালের বাবুগঞ্জে সুগন্ধা নদীর ভাঙন থামছে না। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে একটি পুরোনো মসজিদ, বসতভিটা, দোকান ও গাছপালাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙন এখন এগিয়ে এসেছে বাবুগঞ্জ খেয়াঘাটের সড়ক ও পন্টুনের দিকে। এতে সরাসরি ঝুঁকিতে পড়েছে প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাবুগঞ্জ বাজার।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের বাজারসংলগ্ন সুগন্ধা নদীর তীরে ভাঙন শুরু হয়। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দিনভরও ভাঙন অব্যাহত ছিল। নদীর পাড়ের বিভিন্ন অংশে একের পর এক ধস নামায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে একটি পুরোনো মসজিদ, দুটি বসতভিটা, দুটি দোকান এবং বাবুগঞ্জ খেয়াঘাটের গণশৌচাগারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ভাঙনের কবলে পড়েছে খেয়াঘাটে যাতায়াতের একমাত্র সড়কও। ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পন্টুন।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর পাড়ের বিভিন্ন অংশে ধস নেমে বড় বড় মাটির খণ্ড সুগন্ধা নদীতে বিলীন হচ্ছে। ভাঙন থেকে নিজেদের স্থাপনা রক্ষায় নদীপাড়ের গাছপালা ও দোকানঘর সরিয়ে নিচ্ছেন স্থানীয়রা। ভাঙনের গতি অব্যাহত থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই আরও স্থাপনা নদীগর্ভে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক বিপ্লব মিস্ত্রি বলেন, দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে এর প্রভাব বাবুগঞ্জ বাজারেও পড়বে। এতে বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি কয়েকশ মানুষের বসতভিটা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সমাজসেবক মোয়াজ্জেম বিশ্বাস বলেন, বছরের পর বছর বাবুগঞ্জ বাজার ও আশপাশের ঘরবাড়ি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। এবার ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দ্রুত বাজার ও বসতবাড়ি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত নদীভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ধীরে ধীরে বাবুগঞ্জ বাজারের পাশাপাশি কয়েকটি মসজিদ, বাবুগঞ্জ থানা এবং সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ভাঙনের খবর পেয়ে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দিনভর ট্রলারে করে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল।
তিনি জানান, বাবুগঞ্জ লঞ্চঘাট এলাকার সুগন্ধা নদীর বাম তীরে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। খবর পাওয়ার পরপরই তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
জাবেদ ইকবাল বলেন, সুগন্ধা বরিশালের বড় নদীগুলোর একটি। চলতি বর্ষা মৌসুমে নদীটিতে ব্যাপক ভাঙন হচ্ছে। বাবুগঞ্জের এই অংশের জন্য ইতোমধ্যে সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। সমীক্ষার ভিত্তিতে সুগন্ধা নদীর বাম তীরের প্রায় ৩ হাজার ৬২৬ মিটার এলাকায় সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ী তীর সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ পেয়েছে। এখন একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি মাসেই প্রকল্পটি অনুমোদন হবে বলে তারা আশাবাদী। অনুমোদন হলে সিসি ব্লক দিয়ে স্থায়ীভাবে নদীর তীর রক্ষার কাজ করা সম্ভব হবে।
তবে স্থায়ী প্রকল্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলেও বর্তমান ভাঙন পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হবে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, ভাঙনের ছবি ও স্থানীয়দের বক্তব্যসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বরাদ্দ বা নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়রা জানান, ৩ হাজার ৬২৬ মিটার তীর রক্ষার স্থায়ী প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হতে সময় লাগবে। কিন্তু নদীভাঙন অপেক্ষা করবে না। তাই প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই জিওব্যাগ, বালুভর্তি বস্তা ও অন্যান্য জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এখনই ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সুগন্ধা নদী আরও ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে। এতে মসজিদ, দোকান, বসতভিটা, খেয়াঘাটের পন্টুন ও সংযোগ সড়কের পর প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাবুগঞ্জ বাজারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ফলে স্থানীয়দের চোখ এখন একদিকে নদীর অব্যাহত ভাঙনের দিকে, অন্যদিকে সুগন্ধা নদীর বাম তীরের ৩ হাজার ৬২৬ মিটার রক্ষায় প্রস্তাবিত স্থায়ী প্রকল্পের একনেকে অনুমোদনের দিকে।



















